অন্তর থেকে পরিচ্ছন্নতা’

কলকাতা, ১লা মার্চ, ২০২৬: পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও ঝাড়খণ্ড জুড়ে ৫,৫৬৬ ট্র্যাক কিলোমিটারের এক বিশাল কর্মপরিধি নিয়ে পূর্ব রেল প্রতিদিন ৫৮৭টি স্টেশন পরিচালনা করে এবং প্রায় ২,০১৫টি ট্রেন চালায়, যাতে প্রতিদিন প্রায় ৩১ লক্ষ যাত্রী যাতায়াত করেন। এত বিস্তৃত এবং ব্যস্ত নেটওয়ার্ক জুড়ে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা একটি অত্যন্ত কঠিন কাজ—যা পূর্ব রেল নিরন্তর এবং বহুমুখী প্রচেষ্টার মাধ্যমে মোকাবিলা করে চলেছে।
স্বাস্থ্যসম্মত ভ্রমণ নিশ্চিত করতে সমস্ত দূরপাল্লার ট্রেনে অন-বোর্ড হাউসকিপিং স্টাফ মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি জোনের বিভিন্ন স্টেশনে যান্ত্রিক ও কায়িক উভয় পদ্ধতিতেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চালানো হয়। শুকনো ও ভেজা বর্জ্যের জন্য পৃথক ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং রেললাইনে বর্জ্য নির্গমন রোধ করতে ট্রেনের প্রচলিত টয়লেটগুলোর পরিবর্তে বায়ো-টয়লেট স্থাপন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি, চলমান ‘স্বচ্ছ রেল’ অভিযানকে আরও জোরদার করতে বিভিন্ন ডিভিশন পর্যায়ক্রমে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করে থাকে।
এই প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, শিয়ালদহ ডিভিশনের অধীনে থাকা শহরতলি রেল নেটওয়ার্ক ট্র্যাক এবং প্ল্যাটফর্মে বাইরের আবর্জনা ফেলার কারণে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিছু নির্দিষ্ট সেকশনে, রেল ব্যবহারকারী এবং পার্শ্ববর্তী বাসিন্দাদের দ্বারা নির্বিচারে বর্জ্য নিক্ষেপ—যা অনেক সময় স্টেশনের ড্রেনেজ সিস্টেমের মাধ্যমে আসে—পরিবেশগত পরিস্থিতি এবং যাত্রী অভিজ্ঞতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

শিয়ালদহ ডিভিশন স্টেশন বা রেললাইন থেকে বর্জ্য অপসারণের জন্য বারবার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি এমনই আরও একটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গত পক্ষকালে, অর্থাৎ ১৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত, শিয়ালদহ ডিভিশনে জমে থাকা পুরনো আবর্জনা (Legacy Garbage) পরিষ্কার করতে এবং রেলওয়ের মূল্যবান জমি পুনরুদ্ধার করতে একটি নিবিড় পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়েছে। এই দীর্ঘদিনের জমে থাকা আবর্জনা কেবল যাত্রীদের অভিজ্ঞতাই নষ্ট করে না, বরং রেলওয়ে স্থাপনার কাছে মারাত্মক অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও তৈরি করে। এই সময়কালে, অপরিচ্ছন্ন অঞ্চলের অবস্থান অনুযায়ী যান্ত্রিক ও কায়িক পদ্ধতিতে প্রায় ৩০০ টন আবর্জনা অপসারণ করা হয়েছে এবং এর জন্য সর্বোচ্চ আবর্জনা জমে থাকা স্থানগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তদুপরি, এই অভিযানের মাধ্যমে ৫০,০০০ বর্গফুট জমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
শিয়ালদহ ডিভিশনের নিম্নলিখিত স্টেশন এবং এলাকাগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেখানে জবরদখল বা বহিরাগত হস্তক্ষেপে পরিবেশের অবনতি লক্ষ্য করা গেছে:
১. শিয়ালদহ – বজবজ সেকশনের সন্তোষপুর স্টেশন।
২. শিয়ালদহ মেইন লাইন সেকশনের বিধাননগর রোড স্টেশন।
৩. চক্ররেল নেটওয়ার্কের পাতিপুকুর স্টেশন।
৪. শিয়ালদহ – ডায়মন্ড হারবার সেকশনের মগরাহাট।
৫. শিয়ালদহ মেইন লাইন সেকশনের সোদপুর স্টেশন।
৬. শিয়ালদহ দক্ষিণ সেকশনের লেক গার্ডেন স্টেশন।
৭. শিয়ালদহ – সোনারপুর সেকশনের বাঘাযতীন স্টেশন।
পুরনো আবর্জনা শনাক্তকরণ, সংশোধন এবং প্রশমন পরিকল্পনার মাধ্যমে সেগুলোকে যতটা সম্ভব উৎপাদনশীল সম্পদে রূপান্তর করার কাজ সমগ্র শিয়ালদহ ডিভিশন জুড়ে অব্যাহত রয়েছে।

রেললাইন ও চত্বরে নির্বিচারে আবর্জনা ফেলা রেল নিরাপত্তা এবং ট্রেন চলাচলের ক্ষেত্রে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে। জমে থাকা বর্জ্য ট্র্যাকের অবস্থার অবনতি ঘটাতে পারে এবং এর সাথে কাগজ বা প্লাস্টিকের মতো দাহ্য পদার্থ মিশে থাকলে অসাবধানতাবশত ফেলে দেওয়া সিগারেট বা বিড়ির টুকরো থেকে সহজেই আগুন লেগে যেতে পারে।

পূর্ব রেলের কর্মীরা প্ল্যাটফর্ম বা ট্র্যাক থেকে এই আবর্জনা পরিষ্কার করতে গিয়ে নিজেদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলেন। এমনকি শিয়ালদহ শহরতলির মতো ব্যস্ত নেটওয়ার্কে রেললাইনের ওপর এই কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় দুর্ঘটনাজনিত আঘাতের কারণে তাদের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। রেললাইনে আবর্জনা ফেলার ঘটনা যত বাড়বে, পরিচ্ছন্নতা অভিযানের পুনরাবৃত্তিও তত বাড়বে, যা ‘সম্ভাব্যতা তত্ত্ব’ (Theory of Probability) অনুযায়ী দুর্ঘটনাজনিত আঘাতের সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। রেল ব্যবহারকারী এবং যাত্রীদের অন্তত এটি ভাবা উচিত যে, রেলের এই কর্মীরাও মানুষ এবং রেললাইনে আবর্জনা ফেলার মতো আচরণের কোনো যৌক্তিকতা নেই, যা সাফাই কর্মীদের জীবনকে বিপন্ন করতে পারে।

পূর্ব রেল সমস্ত রেল যাত্রী এবং সাধারণ জনগণের কাছে দায়িত্বশীল ও সহমর্মিতার সাথে কাজ করার আবেদন জানাচ্ছে। পরিচ্ছন্নতা একটি যৌথ দায়িত্ব। যত্রতত্র ময়লা না ফেলে এবং নির্ধারিত বর্জ্য ফেলার স্থানগুলো ব্যবহার করে যাত্রীরা একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন এবং মানবিক রেল পরিবেশ তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেন। অন্তর থেকে পরিচ্ছন্ন হোন—কারণ আজকের দায়িত্বশীল আচরণই নিশ্চিত করবে আগামীকালের নিরাপদ রেলযাত্রা ।

Comments

Popular posts from this blog

মহিলা শিক্ষার্থীদের জন্য

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সফলতা

'দরবারী পদাবলী'-তে গুরু-শিষ্য পরম্পরার অনবদ্য নজির কলকাতায়